সোরিয়াসিস
একটি দীর্ঘস্থায়ী দুরারোগ্য চর্মরোগ।
এ রোগ নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই
হতে দেখা যায়। এখন পর্যন্ত এ রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা সম্ভব
হয়নি। এ ক্ষেত্রে ত্বকে প্রথমে প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং সেই স্থানে লালচে
ভাব দেখা যায়। একই সাথে ছোট ছোট গুটি, যা চামড়া থেকে সামান্য উঁচুতে
থাকে। ধীরে ধীরে এগুলো বড় হতে পারে। মাছের আঁশের মতো উজ্জ্বল সাদা শুকনো
চটলা দ্বারা গুটিগুলো আচ্ছাদিত থাকে। এ আঁশগুলো ঘষে ঘষে তুললে আঁশের নিচের
চামড়ায় লালচে ভাব দেখা যায় এবং তা থেকে রসকষ ঝরতে পারে এবং সেখান থেকে মৃদু মৃদু রক্তক্ষরণও হতে থাকে। সাধারণভাবে একজন সোরিয়াসিসের রোগীকে দেখলে
অন্যরা ভয় পেয়ে যায় এবং অনেকেরই ধারণা এটা ছোঁয়াচে। আসলে এটা কোনো
ছোঁয়াচে রোগ নয়। এমনকি জীবাণুজনিত রোগও নয়। তাই তার থেকে অন্য কারো
হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। এটা বড় কোনো শারীরিক সমস্যার সৃষ্টিও করে না।এটি ত্বকের একটি প্রদাহজনিত রোগ।
কাদের হয় :
নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই সমহারে হতে পারে। যেকোনো বয়সেই হয়, তবে ১৫
থেকে ৪০ বছরের মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো
আবিষ্কৃত হয়নি। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রভাব অবশ্যই আছে বলে প্রমাণিত
হয়েছে এবং অনেক কিছুরই প্রভাবে এটা বাড়তে দেখা গেছে। যেমন আঘাত, ইনফেকশন,
দুশ্চিন্তা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, নানা রকম ওষুধ যেমন Ñ ম্যালেরিয়ার ওষুধ,
ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, হরমোন ও কর্টিসন-জাতীয় ওষুধ সেবনে প্রাথমিকভাবে
উপকার পেলেও পরবর্তীকালে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

উপসর্গ :
সোরিয়াসিসের উপসর্গ ত্বকের যেকোনো স্থানেই দেখা দিতে পারে। ত্বক ছাড়া
নখেও দেখা দিতে পারে। ত্বকের যেসব অংশ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, তা হলো
কনুই, হাঁটু, মাথার চামড়া, কোমরের নিচের মধ্যখানের স্থান ইত্যাদি। তবে এটা
শরীরের যেকোনো স্থানের যেকোনো ত্বকে হতে পারে। সাধারণত এ রোগে তেমন কোনো
উল্লেখযোগ্য উপসর্গই থাকে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য চুলকানি ভাব
থাকতে পারে। তবে যাদের এ রোগ হয় তারা লোকসমাজে যেতে ইতস্তত করেন, যাদের
কাছে যান তারাও দেখলে ছোঁয়াচে ভেবে ভয়ে দূরে থাকতে চান। কারণ চামড়া উঠতে
উঠতে এমন এক ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয় যা রোগীর জন্য বিব্রত অবস্থার
সৃষ্টি করে। আসলে কিন্তু এ রোগটি কোনো অবস্থাতেই ছোঁয়াচে নয়। প্রথমে
ত্বকে প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তারপর লালচে ভাব ধারণ করে, সেখানে ছোট ছোট গুটি
দেখা দেয়, ওপরের ত্বকে চলটার আকারে মাছের আঁশের মতো শুকনো চামড়া দেখা
দেয়, যা টানলে চলটা ধরে উঠে আসে। খুঁটে বা টেনে এই চামড়া তুললে নিচে
লালচে চামড়া দেখা যায় যা থেকে রস ঝরে এবং ুদ্র ুদ্র রক্তক্ষরণ দেখা যায়।
সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে ত্বকের উপসর্গের বাইরে সাধারণত কোনো শারীরিক উপসর্গ
থাকে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
যেমন হাত ও পায়ের গিরায় ব্যথা হতে পারে, যাকে বলা হয় সোরিয়াটিক
আর্থোপ্যাথি। এ ছাড়া হাত ও পায়ের তালুতে পুঁজভর্তি দানা দেখা দিতে পারে,
যাকে বলা হয় প্যাস্টুলার সোরিয়াসিস। আবার ছোট ছোট দানার আকারে লালচে
আঁশযুক্ত সোরিয়াসিস যা সারা দেহসহ হাত-পা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, যাকে
বলা হয় গাটেট সোরিয়াসিস। সোরিয়াসিসে নখও আক্রান্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে
নখের রঙ হলুদ হতে পারে এবং নখের গায়ে ছোট ছোট দানার আকারে ফোঁটা দেখা
যায়। নখ পুরু হয়ে যেতে পারে, নখের গায়ে ফাটা ফাটা দাগ দেখা দিতে পারে। এ
ছাড়া সোরিয়াসিসে আর একটি জটিলতা দেখা দিতে পারে যাকে বলা হয় সোরিয়াটিক
এরিথ্রোডারমা, যাতে সারা শরীরের ত্বকে প্রদাহ দেখা দেয় এবং সারা শরীরের
ত্বক লালচে হয়ে ফুটে ওঠে। সারা শরীর থেকে শুকনো আঁশ ঝরে ঝরে পড়তে থাকে। এ
অবস্থায় রোগীর জীবন আশঙ্কাযুক্ত হয়ে পড়ে এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তির
প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সোরিয়াসিস যখন মাথায় দেখা দেয় তখন তাকে বলা
হয় স্কাল্প সোরিয়াসিস। তবে অনেকেই এটাকে মাথার ত্বকের ছত্রাকজনিত চর্মরোগ
(টিনিয়া ক্যাপিটিস) ভেবে ভুল করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে মাথার ত্বক থেকে
গুঁড়ি গুঁড়ি আঁশ উঠতে থাকে এবং আঁশের নিচের ত্বকে লালচে প্রদাহজনিত ভাব
দেখা যায়। তবে মাথায় তেমন কোনো চুলকানি থাকে না। সামান্য থাকলেও অনেকে
আবার খুশকি ভেবেও ভুল করে থাকে ।

ক্ষতিকারক দিক : সরাসরি সূর্যালোক ও শুষ্ক ত্বক সোরিয়াসিস রোগীর জন্য ক্ষতিকর। তাই
সরাসরি রোদে অনেকক্ষণ থাকা যাবে না। ত্বক আর্দ্র রাখতে নিয়মিত অলিভ ওয়েল,
নারকেল তেল বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা যায়।
চিকিৎসা : চিকিৎসায়
এটি সম্পূর্ণরূপে সেরে যাবে, এ কথা বলা ঠিক সঙ্গত হবে না।তবে বর্তমানে
কিছু কিছু চিকিৎসাপদ্ধতি বেরিয়েছে, যা প্রচুর সাফল্য আনতে সক্ষম হয়েছে।
এর মধ্যে Puva থেরাপি অন্যতম। মলমের মধ্যে ক্যালসিপট্রিয়ল ও কোরেসটাল
প্রপায়নেট অন্যতম ।
খাদ্যাভ্যাস ও প্রভাব : সোরিয়াসিস রোগের ক্ষেত্রে খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাসের কোনো সরাসরি প্রভাব
নেই। ডায়াবেটিসের মতো এই রোগে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ওপর
প্রভাব আছে; যেমন আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগ, লিভারের রোগ, রক্তে স্নেহজাতীয়
পদার্থের ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি। রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এই রোগের
মারাত্মক প্রভাব রয়েছে।